IAF abhinandan a real hero of india

“IAF Abhinandan does’t Deserved any Sympathy..”

IAF Abhinandan returns

শ্রদ্ধেয় উইং কম্যান্ডার,
আমি ভারতবর্ষের একজন সাধারণ ছা–পোষা মানুষ। চাকরি, পরিবার, বছরে একটা ঘুরতে যাওয়া আর সামান্য আমোদ–ফুর্তি— এই নিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি জীবনের এতটা বছর। সীমান্তে কী হয়, যুদ্ধ হলে সেনাদের কতটা কষ্ট সহ্য করতে হয়— এসবের তিলমাত্র ধারণা আমাদের নেই। ফেসবুক আর খবরের কাগজে যেটুকু শুনি, তাতে এটুকু ধারণা জন্মেছিল যে, ইস্পাতকঠিন স্নায়ু না হলে কেউ শত্রুর চোখে চোখ রেখে বন্দুক বা কামান দাগতে পারে না।
বুধবারের দিনটা আমার চিন্তাভাবনাকে একধাক্কায় অনেকটাই নাড়িয়ে দিল। আপনি কর্তব্যের খাতিরে শত্রুসেনার এলাকায় ঢুকেছেন। নিশ্চয়ই এই অবস্থাতেও কিছুটা স্নায়ুর চাপ আপনাকে নিতে হয়েছে। অন্তত যে ভিডিওগুলো প্রাথমিকভাবে চোখে এসেছিল, সেটা দেখে আমার তাই মনে হয়েছিল। আপনাকে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে উন্মত্ত পাকিস্তানি জনতা। চোখ–মুখ ফেটে বেরচ্ছে রক্ত। ভেবেছিলাম বোধহয় আপনারও ভয় করেছে। ‘‌ইশ, লোকটার কী হবে এবার’‌— ভিডিও দেখতে দেখতে সেই আলোচনাই করছিলাম অফিসে।


দ্বিতীয় ভিডিওতে দেখলাম, আপনার চোখ বাঁধা। হাত সম্ভবত পিছমোড়া করে বাঁধা। সেই অবস্থায় আপনাকে জেরা করা হচ্ছে। কিছু প্রশ্নের উত্তর আপনি দিচ্ছেন, কিছু প্রশ্নের উত্তরে সটান বলে দিচ্ছেন, ‘‌সরি, আর কিছু বলতে পারব না।’‌ এই বলতে পারব না–র পিছনে যে একটা প্রচ্ছন্ন ‘‌বলব না’‌ রয়েছে, সেটাও স্পষ্টই বুঝতে পারছিলাম। ভাবছিলাম, কী রে বাবা!‌ এই অবস্থায় এত তেজ আসে কোথা থেকে?‌ নিজের পরিচয় জানাতে এক মুহূর্তের কুণ্ঠা নেই। এমনকী গড়গড় করে বলে দিচ্ছেন নিজের সার্ভিস নাম্বারও!‌ কিন্তু যেই প্রশ্ন আসছে মিলিটারি সিক্রেট সংক্রান্ত, অমনি সপাটে আপনার মুখে ‘‌সরি, আর কিছু বলতে পারব না।’‌
ফেসবুকে আমাদের আর এক প্রতিবেশী দেশের কিছু লোক দেখলাম হাসাহাসি করছে আপনাকে নিয়ে। ওই যে আপনি একবার প্রশ্ন করলেন না, ‘‌স্যার, আমি কি জানতে পারি, আমি পাকিস্তান আর্মির হেফাজতে রয়েছি কি না’‌— সেটা নিয়ে। আপনি ‘‌স্যার’‌ বলে সম্বোধন করেছেন বলে আমাদের আর এক প্রতিবেশী দেশের কিছু মানুষের সে কী উল্লাস!‌ স্যার বলেছে মানেই ভয় পেয়েছে ব্যাটা।
স্যার যে শুধু সম্মান জানানোর সম্বোধন নয়, স্যার যে সৌজন্যেরও সম্বোধন, সেটা কে বোঝাবে তাদের?‌
একটু পরে সামনে এল তৃতীয় ভিডিও। আপনার ক্ষতস্থানের শুশ্রূষা হয়েছে। তবু চোখের কোণে কালি এবং আঘাতের ছাপ। চায়ের কাপের চুমুক দিতে দিতে কথা বলছেন আপনি। আপনি বললেন, ‘‌আমি পাকিস্তানি আর্মির ব্যবহারে মুগ্ধ। বিশেষত যে অফিসার আমাকে জনতার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন এবং অন্য যে সৈন্যরা আমার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করেছেন তাঁরা কেউই আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি।’‌ চমকে গেলাম যখন আপনি বললেন, ‘‌দেশে ফিরলেও আমি এই বয়ান বদলাবো না।’‌
ক্রমাগত প্রশ্ন আসছিল আপনার দিকে। বাড়ি কোথায়, কোন মিশনে এখানে এসেছিলেন, আপনার বিয়ে হয়েছে কি না.‌.‌.‌ ‌ব্লা ব্লা ব্লা। যেটুকু দরকার সেটুকুর উত্তর দিলেন। বললেন, চা–টা দারুণ হয়েছে। আর সেই মিলিটারি সিক্রেটের প্রশ্ন যেই এল অমনি বলে দিলেন, ‘‌I’m not supposed to tell you”
বিশ্বাস করুন গায়ে কাঁটা দিলো!‌ এমন দৃশ্য তো আমরা শুধু সিনেমার পর্দায় দেখেছি। যেখানে শত্রু পরিবেষ্টিত হয়েও নায়ক নিজের অবস্থান থেকে একচুল নড়ে না। এমনটা বাস্তবেও হয়?‌ হতে পারে?‌
জেনেভা চুক্তি অনুসারে পাকিস্তান আপনাকে ছাড়তে বাধ্য। যেমনটা কার্গিল যুদ্ধের সময় আটদিনের মাথায় ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের আর এক লেফটেন্যান্ট কে নচিকেতাকে। পুরো ব্যাপারটা রেড ক্রসের অধীনে। কবে কতদিনে আপনাকে ছাড়া হবে, সেটা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। কেন্দ্রে যে সরকারই থাক, তারা এই প্রক্রিয়াটার একটা অংশমাত্র। কারিগর নয়। তবে খারাপটা কোথায় লাগবে জানেন, আপনার মতো অসমসাহসী বীরকে নিয়েও এবার রাজনীতি হবে। দাবি করা হবে নেতামন্ত্রীরাই নাকি আপনাকে ছাড়িয়ে এনেছে। জয়জয়াকার পড়ে যাবে তাদের নিয়ে। যেমনটা পড়েছে এয়ার স্ট্রাইকের পড়ে। নেতাদের ছবি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়ে বলা হচ্ছে এই স্ট্রাইকের জন্য তাঁদের ধন্যবাদ। ক্রমে আড়ালে চলে যাবে আপনার ওই দৃঢ় মুখ আর আপনার হিমশীতল কণ্ঠে বলা কথাটা— “I’m not supposed to tell you”
তবে ছোট্ট করে একটা চিন্তাও আছে।পাকিস্তানের কোনও ব্যাপারে প্রশংসা করলেই আমাদের দেশে দেশদ্রোহী ছাপ্পা লেগে যায়। শহিদ বাবলু সাঁতরার স্ত্রী যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন বলে নিউজ চ্যানেলগুলোর ফেসবুক পেজে কী অশ্লীল গালিগালাজই না করা হচ্ছে শহিদের স্ত্রীকে। সেখানে। আপনি ও দেশের সেনা আধিকারিকদের আচরণের প্রশংসা করেছেন। এবার আপনার গায়ে না দেশদ্রোহীর তকমা লেগে যায়। মন বলছে আর যুদ্ধ হবে না। পাকিস্তান শান্তির বার্তা দিচ্ছে। আর ভারতও নিজের এয়ারফোর্সের কম্যান্ডারকে ফেরত নিয়েই যুদ্ধে ঝাঁপাতে পারবে না। বুঝতে পারছেন কি?‌ একটা যুদ্ধ প্রায় হতে হতেও যদি থেমে যায়, তাহলে সেটার পিছনে আপনারই নাম লেখা থাকবে?‌ সৈন্যরা তো যুদ্ধে করে। যুদ্ধ থামায় এমন সৈনিক তো দেখিনি এতদিন। যুদ্ধ যদি না হয়, তাহলেও কিন্তু আপনার এই “I’m not supposed to tell you” ভারতের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।

আমি একজন সাধারণ ছা–পোষা মানুষ। এখনই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিতিবিরক্ত। এক দু’‌বছরের কন্যা সন্তানের পিতা হিসেবে আমারও ইচ্ছে করে মেয়ে আর একটু বড় হলে ওকে নানারকম গল্প শোনাবো। আমাদের সময়ে কী হতো সে গল্প কোন বাবা–ই না তার মেয়েকে শোনাতে চায়। চারপাশে যা দেখি, তার মধ্যে নেগেটিভিটির পরিমাণই বেশি। কী দেখে বা শুনে বড় হবে আমার মেয়ে। ঘরে ছেলে ঢুকিয়ে দেওয়া, পুলিসকে বোম মারা, গোমূত্রে ক্যানসার সারা, ময়ূরের চোখের জল— এই সব শুনবে আমাদের পরের প্রজন্ম?‌
বিশ্বাস করুন, আপনার এই বীরত্বের নিদর্শন অন্তত আমাকে একটা কাহিনী শোনানোর রসদ দিয়ে গেল। মেয়ে যখন বুঝতে শিখবে, তখন ওকে আপনার গল্প আমি অবশ্যই শোনাবো। এবং সগর্বে শোনাবো। দেখাবো দিল্‌ জিতে নিতে অস্ত্র লাগে না। বুকের পাটা লাগে।
চায়ে পে চর্চা অনেক দেখেছি। কিন্তু শত্রু শিবিরের মধ্যে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আপনার মতো সোজাসাপটা কথা বলতে কাউকে দেখিনি।
৫৬ ইঞ্চি অনেক দেখেছি কিন্তু আপনার মতো ৫৬ ইঞ্চি দেখিনি।

ইতি
আপনার দেশের এক সামান্য ছাপোষা মানুষ, যে নিজের দেশে বসে রাজা তোর কাপড় কোথায় বলার আগেও দু’‌বার ভয় পায় (‌পাছে তার বাড়িতে পাকিস্তানে যাওয়ার টিকিট চলে আসে)

Leave a Reply

Your e-mail address will not be published. Required fields are marked *